1. ajkerkonthosornews@gmail.com : Rafiqul Jasim : Rafiqul Jasim
  2. admin@ajkerkonthosor.com : admin2 :
  3. abdulkhaleque1977@gmail.com : abdul khaleque : abdul khaleque
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৭:১৪ অপরাহ্ন

বিশ্বের সবচেয়ে বড় নারীদের বাজার ‘ইমা কাইথেল’(ছবিঘর)

  • সময় : বুধবার, ৬ জুলাই, ২০২২
  • ২৪৫ ভিউ

রফিকুল ইসলাম জসিম

ভারতের তথা বিশ্বের একমাত্র নারীপরিচালিত বাজার রয়েছে দেশটির উত্তর-পূর্বের মণিপুর রাজ্যে। সেদিক থেকে দেখলে সারা বিশ্বের কাছে এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এই বাজার। স্থানীয় মণিপুরি  ভাষায় বলা ইমা কাইথেল। এটি মনিপুরের রাজধানী ইম্ফলে অবস্থিত। 

মণিপুর রাজ্যটিতে নৃতাত্ত্বিক মণিপুরি জাতির আবাসস্থল। নানান বৈচিত্রে এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য মণিপুর পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ভারতের অর্থনীতিতেও এ রাজ্যটির রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। আর এই মণিপুরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘ইমা কাইথেল’। প্রতিদিন হাজারো-লাখো ক্রেতা এখানে ভিড় জমান। পুরোটাই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় নারীদের দ্বারা।

 

মণিপুর রাজ্যটিতে নৃতাত্ত্বিক মণিপুরি জাতির আবাসস্থল। নানান বৈচিত্রে এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য মণিপুর পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ভারতের অর্থনীতিতেও এ রাজ্যটির রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। আর এই মণিপুরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘ইমা কাইথেল’। প্রতিদিন হাজারো-লাখো ক্রেতা এখানে ভিড় জমান। পুরোটাই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় নারীদের দ্বারা।

মণিপুরী ইমা কাইথেল নামটির আক্ষরিক অর্থ হল ‘মায়েদের বাজার’। ভারতের এই বাজারকে সমগ্র এশিয়া তথা বিশ্বের বৃহত্তম মহিলা পরিচালিত বাজার বলে গণ্য করা হয়। এখানে পুরুষরা কেনাকাটা করতে আসলেও, বেশিরভাগ ক্রেতা এবং বিক্রেতাই নারী। অন্তত ৫০০ বছর আগে, অর্থাৎ ষোড়শ শতকে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে যাত্রা শুরু হয় এ বাজার। সেই সময় থেকেই নারীদের মধ্যে ব্যবসা করার রীতি চালু হয়। তারপর এতবছর কেটে গেলেও সেই ব্যবস্থা অটুট রয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও যে ব্যবসা সামলাতে পারদর্শী তা এই বাজারে গেলে বোঝা যাবে।

জানা যায়, মণিপুরের একটি প্রাচীন বাধ্যতামূলক শ্রম ব্যবস্থার প্রয়োগের ফলেই হয়েছিল এই বাজারের নারী ব্যবসায়ীদের উৎপত্তি। কারণ মৈতৈ সম্প্রদায়ের পুরুষদেরকে একসময় বাধ্যতামূলক ভাবে বাসভূমি ছেড়ে দূরবর্তী জমিতে চাষাবাদ এবং যুদ্ধে লড়তে যেতে হয়েছিল। কিন্তু মহিলারা থেকে গিয়েছিল গ্রামেই। জীবনযাত্রার হঠাৎ এমন পরিবর্তনেও তারা দমে যায়নি। একা হাতে নিজস্ব ধান ক্ষেতে চাষ করে, গৃহস্থালির কাজ সামলে, বাজারে তাদের কৃষি–পণ্য বিক্রি করে নিজেরাই পরিবারের পেট চালাতে থাকে। এই পদক্ষেপই পরবর্তীকালে ইমা কাইথেল বা বাজার সৃষ্টির দিকে মোড় ঘুরে যায়।

ইমা কাইথেল (মা বাজার) মণিপুরের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এখানে দোকানের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। এবং প্রতিটি দোকানের বার্ষিক আয় গড়ে ৭৩ হাজার রুপি। এই বাজারের বার্ষিক টার্ন ওভার ৪০-৫০ কোটি রুপি। এই বাজারে শুধু বিবাহিতরাই দোকান নিতে পারেন। প্রতি মাসে যৎসামান্য টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে পারেন তারা। প্রতিদিন খুব ভোরেই ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও শাল গায়ে বাজারে হাজির হন নারীরা। এবং সারাদিন বেচা-কেনা করে সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফিরে যান।

ইমা কাইথেলের ভিতরে দোকানিরা ছোট ছোট চৌকির উপর থরে থরে পন্য সাজিয়ে বসে আছে। প্রতিটি চৌকির নিচে বড় বড় ট্রাংক, দিন শেষে আবার সেখানে রাখা হবে পণ্যগুলো। সোমবার থেকে শনিবার প্রতিদিন বাজারটি খোলে ভোর সাতটায় আর বন্ধ হয় সন্ধ্যে ছয়টায়৷ শুধু রবিবার ইমা কাইথেল একটু দেরি করে খোলা হয়৷ তাও সকাল ১০টার মধ্যেই৷ নানা ধরণের পণ্য কেনা-বেচা হয় শুধুমাত্র নারীদের দ্বারা পরিচালিত এই বাজারটিতে, যা পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে৷

নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, যেমন চাল ডাল, মাছ-মাংস, শাক-সবজি ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় বাঁশ বা ধাতুর তৈরি নানান হস্তশিল্প সামগ্রী, শুটকি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, দোপাট্টা, চাদর, আদিবাসী সংস্কৃতির শেকড়-বাকড়, ঔষধপত্র ইত্যাদি পাওয়া যায় অলঙ্কার সামগ্রীও। বলতে গেলে কাপড় থেকে শুরু করে মশলা, তাজা ফল-মূল, শাক-সবজি কী নেই সেখানে! জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সমস্তরকম জিনিসই পাবেন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা সময়ে উপনিবেশিক শক্তি ধেয়ে এসেছে ভারতবর্ষে। এসেছে সরল জীবনের নিসর্গ মণিপুরের দিকেও। আর ভূখণ্ড রক্ষার জন্য মণিপুরের বেছে নিতে হতো যুদ্ধের পথ। যার ফলে পুরুষদের প্রায়ই থাকতে হতো যুদ্ধে। ঐতিহাসিকদের ধারণা, সেরকম এক সময়ে পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতি চালু রাখতে মণিপুরের নারীরা এই বাজারের জন্ম দিয়েছেন। আর দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে নারী উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত বছর ধরে।

ঐতিহ্যের দিক থেকে মণিপুর নারী প্রধান। সে সমাজে নারীরা সব সময়ই এগিয়ে থাকে। সামাজিক সবধরণের বিপর্জয়ের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড়াতে দেখা যায়। হোক তা মদ-মাদকের বিরুদ্ধে, হোক তা আফসপা’র বিরুদ্ধে, কিংবা রাষ্ট্রীয় কোন সিদ্ধান্ত।
এই বাজারটি চালনা করা হয় মহিলা সমিতি দ্বারা।

এছাড়া এই বাজারে শুধুমাত্র বিবাহিত মহিলাদেরই ব্যবসা করার অনুমতি আছে। এমনটাই বহু বছরের রীতি। এই বাজারে বিবাহিত মহিলারা ওই পরিচালনা সমিতির থেকে টাকা ধার নিয়ে জিনিস কেনে ও ব্যবসা শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে সেই ধার শোধ় করে দেয়।

ইমা কাইথেল শুধু যে বেচা-কেনার জায়গা হিসেবেই ব্যবহার হয়ে থাকে তা নয়, এখানে এসে মায়েরা নানা বিষয় নিয়ে গল্পগুজবও করেন৷ অনেকটা ‘মিটিং পয়েন্ট’-এর মতো৷ আর সেখানে, সেই আলোচনায় রাজনীতিও স্থান পায়৷ এই বাজার নিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠেছিলেন এই নারীরা।

১৯৩৯ সালে নুপি লান-এর সময়, ইমা কাইথেলের মহিলা ব্যবসায়ীরা স্থানীয় শাসকের অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন, সভা, সমাবেশ এবং অবরোধের আয়োজন করেছিল, যারা সম্পূর্ণরূপে ছিল ব্রিটিশদের হাতের পুতুল। ওই আন্দোলনকে দমন করার প্রয়াসে, ব্রিটিশরা ইমা কেইথালের দোকানগুলোকে বিদেশী এবং বহিরাগত ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মহিলারা তাদের বাজারকে কঠোর হাতে রক্ষা করে।

২০০৩ সালে ভারত সরকার এই বাজার ভেঙে সুপার মার্কেট করার সিদ্ধান্ত নেয়। মণিপুরি নারীরা তাও প্রতিরোধ করে। ২০১৬ সালে ভুমিকম্পে বাজার কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বছর দুয়েক বেচাকেনার গতি বেশ কম থাকায় ইম্ফল পৌরসভার তরফ থেকে এই বাজারটিকে বড় করে চার তলা বিল্ডিং বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই মহিলারা দোকান চালান। এখন আবার তা পূর্বের গতিতে চলছে। ইমা কাইথেল তাদের কাছে শুধুমাত্র একটা বাজার নয়, তাদের সংস্কৃতির পরিচয় ছিল।




Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরি আরোও পড়ুন
© All rights reserved 2022 Ajkerkonthosor.com
Developed By Radwan Web Service