1. ajkerkonthosornews@gmail.com : Rafiqul Jasim : Rafiqul Jasim
  2. admin@ajkerkonthosor.com : admin2 :
  3. abdulkhaleque1977@gmail.com : abdul khaleque : abdul khaleque
মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৪৮ অপরাহ্ন

ঈদ উদযাপন ও পশু কোরবানির নিয়মাবলি

  • সময় : শুক্রবার, ৮ জুলাই, ২০২২
  • ১৩৪ ভিউ

আগামী রোববার সারা দেশে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। এটি  মুসলিম উম্মাহর অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। ঈদের দিন মুমিন-মুসলিমরা আনন্দ উদযাপন করেন। আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে মেতে ওঠেন অনাবিল আনন্দে। এ দিনের বড় ইবাদত আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করা। ইসলামের বিধি অনুযায়ী ঈদুল আজহা উদযাপন ও পশু কোরবানির নিয়মাবলি নিয়ে লেখা আমিন ইকবাল ও আরিফ খান সাদ। সম্পাদনা- রফিকুল ইসলাম জসিম

ঈদ এলো যেভাবে

আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এলেন, দেখেন সেখানকার অধিবাসীরা বছরে দুদিন উৎসব পালন করে। সেই উৎসব সম্পর্কে নবীজি (সা.) জানতে চাইলে মদিনাবাসী বলে, ‘জাহেলি যুগ থেকে আমরা এ দুদিন উৎসব পালন করে আসছি।’ পরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের এই দুদিনের বদলে আরও উত্তম দুদিন দিয়েছেন উৎসবের জন্য। সে দুদিন হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।’ (আবু দাউদ : ১/১৬১)। সেদিনের পর থেকে মুসলিম জাতি বছরে দুটি ঈদ উৎসব পালন করে আসছে স্বমহিমায়, সগৌরবে।

ঈদুল আজহার বড় ইবাদত কোরবানি

মুসলিমদের ঈদ যেমন আনন্দের; তেমনি ইবাদতেরও। ঈদের নামাজ, পশু কোরবানি, তাকবির প্রদানসহ নানা আমল রয়েছে এদিন। তবে ঈদুল আজহার সবচেয়ে বড় আমল হলো আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করা। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহ পরীক্ষা করেন বান্দা কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারে তার রবের জন্য। একই সঙ্গে সামর্থ্যবান ব্যক্তির সম্পদ থেকে পশু কোরবানির মাধ্যমে গরিবের ঘরেও আনন্দ বিলানোর ব্যবস্থা করেন আল্লাহ। কোরবানির গোশত কোরবানিদাতা একা খেতে পারবে না; পাড়া-প্রতিবেশী অসহায়-গরিবকেও দিতে হবে। কোরবানির গোশত তিন ভাগ করা সুন্নত। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশীদের জন্য, আরেক ভাগ অসহায়-গরিবের জন্য। এভাবেই কোরবানি মুসলিম সমাজে উদ্যমতা তৈরি করে। ধনী-গরিবের পার্থক্য মিটিয়ে সাবইকে এক কাতারে নিয়ে আসে। ঈদের খুশিতে আন্দোলিত করে তোলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে।

ঈদের দিন গোসল ও সাজসজ্জা

ঈদের দিন সকাল সকাল গোসল করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা সুন্নত। কারণ এ দিনে নামাজ আদায়ের জন্য মুসলমানরা ঈদগাহে একত্র হয়ে থাকে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)। এদিন উত্তম জামাকাপড় পরাও সুন্নত। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) দুই ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার আগে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ সামর্থ্য থাকলে নতুন পোশাক পরা, অন্যথায় নিজের পরিষ্কার উত্তম পোশাক পরা। হজরত নাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদের দিন উত্তমভাবে গোসল করতেন, সুগন্ধি থাকলে তা ব্যবহার করতেন, নিজের সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন। অতঃপর নামাজে যেতেন। (শরহুস সুন্নাহ : ৪/৩০২)

তাকবির বলে ঈদগাহে যাওয়া-আসা

ঈদমাঠে এক পথ দিয়ে যাওয়া ও অন্য পথ দিয়ে ফেরা সুন্নত। সম্ভব হলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়াও সুন্নত। যাওয়া-আসার সময় তাকবির বলা। তাকবির হলো ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহ আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ বাক্যটি উচ্চৈঃস্বরে পড়া। পুরুষরা এ তাকবির উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নীরবে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন।’ (মুসতাদরাক : ১১০৬)। জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজের পর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর এ তাকবির একবার পাঠ করা ওয়াজিব। (ফাতহুল বারি : ২/৫৮৯)

নামাজ আদায়

ঈদের দিন সকালে পুরুষদের জন্য ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। ঈদের নামাজের মাধ্যমেই ঈদের প্রকৃত আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ঈদের সব প্রস্তুতি মূলত আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে শুকরিয়াস্বরূপ দুই রাকাত নামাজ পড়ার মাধ্যমে। ঈদের নামাজ খোলা ময়দানে আদায় করা উত্তম। ঈদের নামাজে আজান ও আকামত নেই। দুই রাকাত নামাজে অতিরিক্ত ৬ তাকবির (আল্লাহু আকবার) দিতে হয়। প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমা ও ছানা পড়ার পর সুরা ফাতেহার আগে অতিরক্তি ৩ তাকবির (আল্লাহু আকবার) দিতে হয়। তারপর যথারীতি প্রথম রাকাত সম্পন্ন করে দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ফাতেহা ও কেরাত পড়ার পর রুকুর আগে ৩ তাকবির (আল্লাহু আকবার) দিতে হয়। তারপর যথারীতি নামাজ সম্পন্ন করতে হয়। নামাজ শেষে খুতবা শোনা।

শুভেচ্ছা বিনিময়


ঈদে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো শরিয়ত অনুমোদিত একটি বিষয়। বিভিন্ন বাক্য দ্বারা এ শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। যেমনÑ ১. হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, সাহাবায়ে কেরামরা ঈদের দিন সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেন ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ অর্থ আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনার ভালো কাজগুলো কবুল করুন। ২. ঈদ মোবারক ইনশাল্লাহ।  ৩. ‘ঈদুকুম সাঈদ’ বলেও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়।

খাবার গ্রহণ ও অভাবীদের খাওয়ানো


ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের আগে কিছু না খেয়ে নামাজ আদায়ের পর কোরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী কারিম (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের আগে খেতেন না।’ (তিরমিজি : ৫৪৫)। ঈদের দিন এতিম-অভাবীদের খোঁজ-খবর নেওয়া, তাদের খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া। এটা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা দাহার : ৮)

আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া


ঈদের সময় আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেওয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। পাশাপাশি প্রতিবেশীরও খোঁজখবর নেওয়া। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতাপিতার সঙ্গে, নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম-মিসকিন, প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পাশর্^বর্তী সঙ্গী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাসদাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদের, যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।’ (সুরা নিসা : ৩৬)

মনোমালিন্য দূরীকরণ


জীবন চলার পথে বিভিন্ন পর্যায়ে কারও কারও সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। ঈদের সময় পারস্পরিক মনোমলিন্য দূর করা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে, দেখা সাক্ষাৎ হলে একজন অন্য জনকে এড়িয়ে চলে। এ দুজনের মধ্যে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে প্রথম সালাম দেয়।’ (মুসলিম : ৬৬৯৭)

বিনোদন ও আনন্দ প্রকাশ

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে সুষ্ঠু বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। উম্মুল মোমিনিন আয়েশা ( রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন আমার ঘরে এলেন, তখন আমার কাছে দুটি ছোট মেয়ে গান গাচ্ছিল বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। এরই মধ্যে আবু বকর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসুলুল্লাহ (সা.) তার কথা শুনে বললেন, ‘মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ (বোখারি : ৯৫২)

বর্জনীয় কিছু কাজ


ঈদকে কেন্দ্র করে অনেক বিজাতীয় আচরণ মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পোশাক-পরিচ্ছদে, চাল-চলনে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে অমুসলিমদের অনুকরণে লিপ্ত হয় মুসলমানদের অনেকে। এটা কখনই কাম্য নয়। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ : ৪০৩৩)। ঈদের দিন নারীরা ব্যাপকভাবে বেপর্দা অবস্থায় রাস্তাঘাটে খোলামেলা ঘোরাফেরা করে। এ থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের অধীন মেয়েদেরও বিরত রাখতে হবে। এ বিষয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন মূর্খতার যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ (সুরা আহজাব : ৩৩)। ঈদের কেনাকাটায়ও অনেকে অপচয় ও অপব্যয় করে। এসব কিছুই বর্জনীয়।

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা


ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা ও হাড় থেকে যেন পরিবেশ দূষিত না হয়Ñ সে দিকে প্রত্যেকের সতর্ক হওয়া উচিত। কোরবানি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, আবর্জনা ও হাড় নিরাপদ দূরত্বে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা। পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য এবং ইবাদত। আল্লাহ তাআলা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতাকে বেশি ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালোবাসেন।‘ (সুরা
তাওবা : আয়াত ১০৮)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।’ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার প্রতি তিনি অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই কোরবানির পশুর রক্ত-আবর্জনা পরিষ্কার করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্বও।

কোরবানি এলো যেভাবে


কোরবানি আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থÑ আত্মত্যাগ, সান্নিধ্য। অর্থাৎ পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট তারিখে সামর্থ্যবান মুসলমানের হালাল উপায়ে অর্জিত হালাল ও বলবান পশু আল্লাহর নামে জবাই করা। আজ থেকে ৩৮০০ সৌর বছর পূর্বে মক্কা নগরীর মীনা প্রান্তরে অশীতিপর আল্লাহপ্রেমিক ইবরাহিম (আ.) তার প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে বিসর্জন দিতে উদ্যত হয়েছিলেন আল্লাহর নির্দেশ পালনে। পিতা-পুত্রের অভূতপূর্ব আত্মনিবেদনে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ ফেরেশতা মারফত দুম্বা পাঠিয়ে দেন এবং সেটা জবাই করা হয়। সে ধারাবাহিকতা আজও মুসলিম উম্মাহ আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে জারি রেখেছে পশু কোরবানির রীতি। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার : ২-৩)

যাদের ওপর ওয়াজিব


ইসলামে ‘সাহেবে নিসাব’ (সম্পদশালী) মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। ‘সাহেবে নিসাব’ অর্থ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ কিংবা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য কিংবা সমমূল্যমান সম্পদের অধিকারী। কোরবানির দিনগুলোতে কেউ এ পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার পক্ষ থেকে কোরবানি আদায় করতে হবে। বর্তমান বাজারে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্য ৬০-৬৫ হাজারের মধ্যে। তাই কেউ যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণের অতিরিক্ত ৬০-৬৫ হাজার টাকার মালিক হয় তা হলে সম্পদশালী হিসেবে গণ্য হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক, পাগল বা মুসাফির ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলেও তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।

নিয়তের শুদ্ধতা


কেবল কোরবানি নয়; আমাদের প্রতিটি ইবাদত ও পুণ্যকাজ শুধু আল্লাহ তায়ালা ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত, রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (অন্তরের বিশুদ্ধতা)।’ (সুরা হজ : ৩৭)। প্রসিদ্ধ হাদিস ‘আমলের কর্মফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’ এবং এ রকম আরও অনেক হাদিস রয়েছে। যেগুলো থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, বিশুদ্ধ নিয়ত ব্যতীত বান্দার কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। তাই কোরবানিদাতার জন্য সর্বাগ্রে আবশ্যক হচ্ছেÑ বিশুদ্ধ নিয়তে কোরবানি করা। অনেকেই লোক দেখানো, লোকলজ্জা, সম্মান অর্জন, প্রতিযোগিতা, রেওয়াজ, গোশত খাওয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে কোরবানি করেন। এটা অনুচিত।

উপযুক্ত পশু


কোরবানির জন্য পশুর স্বাস্থ্যগত ও গুণগত কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। সব জায়েজ পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া যায় না। কোরবানি জন্য শরিয়ত পশু নির্ধারণ করে দিয়েছে। মোট ছয় প্রকার পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ। সেগুলো হলোÑ উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল। এগুলো ছাড়া অন্য পশু দিয়ে কোরবানি জায়েজ নেই। কোরবানি করার জন্য ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স কমপক্ষে এক বছর পূর্ণ হতে হবে। অবশ্য ছয় মাসের ভেড়া যদি দেখতে মোটাতাজা হয় এবং এক বছর বয়সের মতো মনে হয়, তা হলে তা দিয়েই কোরবানি করা বৈধ। গরু-মহিষের হতে হবে পূর্ণ দুই বছর। আর উটের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে। (হেদায়া : ৪/১০৩)

কোরবানি করা যায় যেসব দিনে

ঈদুল আজহার নির্ধারিত দিন ১০ জিলহজ। এ দিনেই ঈদের নামাজ পড়া হয়, পশু কোরবানি করা হয়। তবে কেউ এ দিন কোরবানি করতে না পারলেও সুযোগ রয়েছে। ১০ জিলহজ ঈদুল আজহার দিনসহ আরও দুদিন কোরবানি করা যাবে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজ পড়ার পর থেকে শুরু করে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানি করা যাবে। তবে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পর কোরবানি বৈধ নয়। এমনকি যদি কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, ১০ ও ১১ জিলহজ ভ্রমণে থাকে। তারপর ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে বাড়ি ফিরে আসে, তবে তার ওপরও কোরবানি করা ওয়াজিব হবে।’ (ফাতাওয়া আলমগিরি)

কোরবানির পশু দোষত্রুটিমুক্ত হতে হবে।

কোরবানির পশু দোষত্রুটিমুক্ত হতে হবে। পশুর মধ্যে যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি দেওয়া যাবে না সেগুলো হচ্ছে ১. দৃষ্টিশক্তি না থাকা। ২. শ্রবণশক্তি না থাকা। ৩. অত্যন্ত দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ হওয়া। ৪. এই পরিমাণ লেংড়া যে জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম। ৫. লেজের বেশিরভাগ অংশ কাটা। ৬. জন্মগতভাবে কান না থাকা। ৭. কানের বেশিরভাগ কাটা। ৮. গোড়াসহ শিং উপড়ে যাওয়া। ৯. পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া। ১০. বেশিরভাগ দাঁত না থাকা। ১১. রোগের কারণে স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া। ১২. ছাগলের দুটি দুধের যেকোনো একটি কাটা। ১৩. গরু বা মহিষের চারটি দুধের যেকোনো দুটি কাটা। অর্থাৎ কোরবানির পশু বড় ধরনের দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে নাÑ অন্ধ, যেটার অন্ধত্ব স্পষ্ট। রোগাক্রান্ত, যার রোগ স্পষ্ট। পঙ্গু, যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট ও আহত যার কোনো অঙ্গ ভেঙে গেছে।’ (ইবনে মাজা : ৩১৪৪)

যে দোষ থাকলে কোরবানি হবে

পশুর কিছু ত্রুটি এমন আছে যেগুলো থাকলেও কোরবানি দেওয়ার সুয়োগ রয়েছে। সেগুলো হলোÑ ১. পশু পাগল, তবে ঘাস-পানি ঠিকমতো খায়। ২. লেজ বা কানের কিছু অংশ কাটা, তবে বেশিরভাগ অংশ আছে। ৩. জন্মগতভাবে শিং নেই। ৪. শিং আছে, তবে ভাঙা। ৫. কান আছে, তবে ছোট। ৬. পশুর একটি পা ভাঙা, তবে তিন পা দিয়ে সে চলতে পারে। ৭. পশুর গায়ে চর্মরোগ। ৮. কিছু দাঁত নেই, তবে বেশিরভাগ আছে। স্বভাবগত এক অণ্ডকোষের পশু। ৯. পশু বয়োবৃদ্ধ হওয়ার কারণে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম। ১০. পুরুষাঙ্গ কেটে যাওয়ার কারণে সঙ্গমে অক্ষম। তবে উত্তম হচ্ছে ত্রুটিমুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া। পশু কেনার সময় এসব বিষয় বিবেচনা করা কর্তব্য।

পশুতে অংশীদারের বিধান

যে ছয় প্রকার পশু দিয়ে কোরবানি করা যায়, তার তিন প্রকারে অংশীদার হওয়া যাবে, আর তিন প্রকারে অংশীদার হওয়ার সুযোগ নেই। উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল; এগুলোর মধ্যে উট, গরু, মহিষÑ এই তিন প্রকার পশুর এক একটিতে এক থেকে সাতজন পর্যন্ত অংশীদার হয়ে কোরবানি করতে পারবেন। অংশীদারের সংখ্যা জোড় বা বেজোড় রাখতে হবেÑ এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যে পশুতে সাতজন শরিক হতে পারে তাতে শরিকের সংখ্যা বেজোড় হওয়া জরুরি নয়। কেউ চাইলে একাই একটি গরু, উট বা মহিষ কোরবানি দিতে পারবেন। আর কয়েকজন মিলে একটি পশু কোরবানি দিলে অংশীদার সবার নিয়ত ঠিক থাকতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কোরবানি দিতে হবে। কোনো একজন অংশীদার যদি গোশত খাওয়ার জন্য কোরবানি করে, তা হলে অন্যদের কোরবানির সমস্যা হবে।

কোরবানির সঙ্গে আকিকা

সন্তান জন্মের সপ্তম দিন আকিকা করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। কোরবানির দিনগুলোতে আকিকার দিন মিলে গেলে, যেসব পশুতে একাধিক অংশীদারের সুযোগ রয়েছে তার সঙ্গে আকিকার ভাগ রাখা যাবে। অর্থাৎ উট, গরু ও মহিষে যেহেতু সর্বোচ্চ ৭টি অংশ রয়েছে, তাই এক বা একাধিক অংশ দিয়ে আকিকা করতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ আকিকাও এক ধরনের কোরবানি। হাদিস শরিফে কোরবানি ও আকিকা দুটোর ওপরও ‘নুসুক’ অর্থাৎ কোরবানি শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। (নাসায়ি : ১৬৩)। আকিকাও যখন এক প্রকারের কোরবানি, তখন একটি গরু, মহিষ বা উট দ্বারা সাতজন পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তির আলাদা-আলাদা কোরবানি আদায় হওয়ার হাদিস থেকে কোরবানি-আকিকা একত্রে আদায়ের অবকাশও প্রমাণিত হয়।

পশু জবাইয়ের মাসআলা

কোরবানিদাতা নিজ হাতে জবাই করবেন। সম্ভব না হলে জবাইকালে সামনে থাকবেন। মুসলিম ব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে পশু জবাই করবেন। জবাইকারী অমুসলিম হলে কোরবানি আদায় হবে না এবং গোশত খাওয়া জায়েজ হবে না। যে স্থানে জবাই করা হবে, সেখানে পশুকে কেবলার দিকে মুখ করে সহজভাবে শোয়ানো ও তাড়াতাড়ি জবাই করা মুস্তাহাব। জবাইকারী কেবলার দিকে চেহারা করে জবাই করা মুস্তাহাব। পশু কোরবানি করার পর জীবিত বাচ্চা পাওয়া গেলে কোরবানির দিনসমূহের মধ্যে তা কোরবানি করে দিতে হবে। বাচ্চার গোশত খাওয়া জায়েজ। ধারালো ছুরি-চাকু দিয়ে জবাই করা মুস্তাহাব। এর বিপরীত মাকরুহ। এক পশুর সামনে আরেক পশু জবাই করা মাকরুহ। জবাই করার পর অঙ্গ-প্রতঙ্গের নাড়াচাড়া পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পূর্বে কাঁটা-ছেঁড়া করা মাকরুহ। পশু জবাই করা, গোশত কাঁটা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি কোনো কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির পশুর গোশত, হাড্ডি, চামড়া তথা পশুর কোনোকিছু দেওয়া জায়েজ নয়। টাকা বা অন্য কোনো কিছু দিয়ে পারিশ্রমিক দেবেন। কোরবানিদাতার জন্য কোরবানি পশুর চামড়া ব্যতীত গোশত, হাড্ডি ইত্যাদি কোনো কিছুই বিক্রি করা জায়েজ নয়।

গোশত বণ্টনের নিয়ম

কোরবানির গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে, আহার যোগ্য সব কিছু তিনভাগ করে একভাগ নিজের জন্য রাখবেন, একভাগ পাড়া-পড়শি, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করবেন এবং একভাগ দরিদ্রদের দেবেন। আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.) এর একটি আছার এমন- ‘এটা আল্লাহ পাক হতে অনুগ্রহ; কোরবানির মাংস পুরোটা নিজেরা খাওয়া যাবে, দরিদ্রদের দান করা যাবে বা পুরোটা উপহার হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের বিতরণ করা যাবে। এ ছাড়া ইবন মাসঊদ (রা.) কোরবানির গোশত তিনভাগ করে একভাগ নিজেরা খেতেন, একভাগ যাকে চাইতেন তাকে খাওয়াতেন এবং একভাগ ফকির-মিসকিনকে দিতেন বলে উল্লেখ রয়েছে। ইসলামের বিভিন্ন ইমামগণও কোরবানির গোশতকে তিনভাগ করাকে মুস্তাহাব বলে উল্লেখ করেছেন।

চামড়া কী করবেন


কোরবানিদাতা ইচ্ছা করলে পশুর চামড়া নিজের কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারবেন বা অন্য যে কাউকে দান বা হাদিয়া করতে পারবেন। চামড়া বিক্রি করে দিলে তা দরিদ্রের অধিকার হয়ে যায়। তাই এর বিক্রয় মূল্য অবশ্যই নিঃস্ব-অসহায়, দরিদ্র-মিসকিন তথা (এক বা একাধিক) হকদারকে দিয়ে দিতে হবে। মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব ইত্যাদি ধর্মীয় বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান, জনসেবামূলক কাজ, কোনো কিছুর পারিশ্রমিক বা ঋণ পরিশোধ কাজে ব্যবহার করা বা দেওয়া জায়েজ নয়। লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিমখানায় দেওয়া যাবে।




Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরি আরোও পড়ুন
© All rights reserved 2022 Ajkerkonthosor.com
Developed By Radwan Web Service